← Site আমি যেভাবে ভালো মানুষ হয়ে উঠলাম

Chapter 1 / 51 · 6 min

আমি যেভাবে ভালো মানুষ হয়ে উঠলাম


আমার প্রথম খুনটা ছিল জবাই করে, আবছার ভাই লোকটাকে মাটিতে চেপে ধরে রেখেছিল - আমি গলা বরাবর ছুরিটা রেখে চাপ দিলাম।

ছোট বেলায় কুরবানীর সময় গরু জবাই দেখতাম, বড় হয়ে মানুষ জবাই করলাম। খুব যে একটা তফাত আছে দুইটায় - তা না। কিন্ত মানুষ জবাই এর কিছু নিয়ম আছে। কাটাকাটি গুলা একটু কেয়ারফুলভাবে করা লাগে। আবছার ভাই বলেছিল, আমি নাকি জাত খুনি, খুন নাকি আমার রক্তে। প্রথম খুন নাকি কারোই এত নিখুত হয়না।

অথচ আমার একবারো মনে হয়নি আমার প্রথমবারের মতো খুন করছি। মানুষ খুন করা আর মুরগী জবাই করে চামড়া ছিলার মাঝে খুব একটা তফাত আমার কাছে মনে হয়না। খুব সম্ভবত এজন্যই প্রফেশনাল কিলার হিসেবে আমার সুনাম এবং মার্কেট খুব তাড়াতাড়িই ছড়িয়ে গেসিল।

বিশেষ করে এক বড়লোকের মেয়েকে খুন করে পাঁচ টুকরা করার পর আমার ডিমান্ড অনেক বেড়ে যায়। আমি তখন আর আবছার ভাই এর সাথে কাজ করিনা। লোকজন আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করে। আমার কোন ম্যানেজার অথবা চামচার প্রয়োজন হয়নি।

রেট ফিক্সড। গুলি করে খুন - পনের হাজার টাকা, আর ১০ বাড়িয়ে দিলে লাশ গুম - গ্যারান্টেড। খুজে পেলে খুনের টাকাও ফেরত দিয়ে দেই। আর জবাই করে খুন করলে টাকা টা একটু বেশী নেই। তখন একজন এসিস্টেন্ট লাগে, তাকেও চা নাস্তার টাকা টা ধরায়ে দিতে হয়। আর জবাই করার পর পাঁচ টুকরা করতে বললে, রেট টা ফিক্সড চল্লিশ হাজার। এ পর্যন্ত টোটাল ২৭ টা খুন করেছি, কিন্ত আমি সেই খুনের গল্প বলতে আসিনি।

আমি আজ আমার ভালো হয়ে যাবার গল্পটা বলতে এসেছি।

এক বিকালে আবছার ভাই ফোন দিলো। ফোন ধরতেই বলল, “ একটা কাজের অফার আছে।”

আবছার ভাই এর হাত ধরেই এই লাইনে এসেছি, ঠিক। কিন্ত এইখানে কারো প্রতি নরম থাকলেই সমস্যা। আমি বললাম, “যে অফার দিসে, তারে আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন”

আবছার ভাই সূক্ষ্ম অথচ অপ্রয়োজনীয় অপমানটি হজম করে বললেন, ছোট কাজ। ত্রিশ হাজার টাকা বাজেট। করলে বলিস।

আমি একটু ভেবে দেখলাম। গুলি করে মারায় কোন মজা নেই। কিছুই ফিল হয়না। কিন্ত জবাই করা একটা আর্ট। সবাই পারেনা। আর সেটার জন্য চল্লিশের কম হলে কোনভাবেই পোষায় না। আমার গুলি করেই মারা উচিত - কিন্ত আত্মতৃপ্তি বলে তো একটা কথা আছে, সবসময় টাকার কথা ভাবলে হয়না।

মনে আছে, একদম শুরুর দিকে। আমার তৃতীয় কিংবা চতুর্থ খুন। নদীর পাড়ে দাঁড় করে রেখেছিলাম বুড়াটাকে। হাতে রিভলবার - লোড করা। বুড়া কাঁপছিল। বলল, “কত পাবে তুমি আমাকে মেরে? এক লাখ? দুই লাখ? আমি কয়েক কোটি টাকার মালিক। ছেড়ে দাও, এক কোটি টাকা দেব তোমাকে।”

কথাটা বলার সাথে সাথেই গুলি করে দিয়েছিলাম বুড়াটাকে। খুনী হতে পারি, নিমকহারাম নই।

আগেই বলেছিলাম, আমার খুনের গল্প বলতে আসিনি। আমার ভালো হয়ে যাবার গল্প বলতে এসেছি।

টার্গেট পাবার পর আমি বুঝলাম কেন বাজেট এত কম। ছোট একটা বাচ্চা ছেলে। একে খুন করে লাশ গুম করা কোন ব্যপার না। কিন্ত আমি আশাহত হলাম। ছোট বাচ্চা জবাই করে কোন মজা নেই। বেশী কাতড়ায়না। চাকু গলায় ধরতেই ঢুকে যায় - নরম গলা। আর চাকু ঢুকতেই মরে যায় - নরম শরীর।

বাচ্চা ছেলে বলে আমি কোন এসিস্ট্যান্ট রাখিনি। এমনিতেই বাজেট কম। একবার ভাবলাম গুলি করে শেষ করে দেই, পরে মনে হলো অনেক দিন জবাই করিনা। হাত পাকানো দরকার।

ছেলেটার মুখ থেকে যখন কালো কাপড় সরিয়ে নিলাম, তখন ছেলেটা ড্যাব ড্যাব চোখে আমার দিকে তাকালো। ভরা পূর্ণিমায় নদীর পাড়ের সব কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। পূর্ণিমার রাতে জবাই করার অন্যরকম মজা। সাদা আলোয় লাল রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হতে থাকে। ভালো লাগে দেখতে।

ছেলেটা হঠাত আমাকে চমকে দিয়ে বলল, “আসসালামুয়ালাইকুম আংকেল”

আমি হকচকিয়ে গেলাম। ছেলেটা দেখতে সুন্দর। আমি আমতা আমতা করে বললাম, “ওয়ালাইকুম আসসালাম”

“আংকেল পানি হবে একটু? প্লীজ?”

আমি বললাম, “হ্যা নিশ্চয়ই।একটু দাঁড়াও।”

ছেলেটা একটু থামলো, বলল, “আমরা অনেক গরীব আংকেল।”

আমি রিভলবার টা বের করলাম ততক্ষ্ণে। বেশী কথা বললেই ঝামেলা। মন নরম হয়ে যাচ্ছে, অদ্ভুত। ঠিক কপাল বরাবর একটা গুলি করবো। শেষ। ব্যথা টের পাবার আগেই মরে যাবে।

রিভলবার দেখেই ছেলেটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো, “প্লীজ আংকেল , প্লীজ। প্লীজ। আমাকে মারবেন না, প্লীজ… প্লীজ… “

আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিলনা যে আমার তখন মনে হয়েছিল, ত্রিশ হাজার টাকা ই তো। থাকনা। আরো অনেকখানি অবিশ্বাস নিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম , আমি ছেলেটাকে বলছি, “আচ্ছা যাও… ছেড়ে দিলাম!”

এর পর আমি ছেলেটার দুই হাতের বাধন খুলে দিলাম। বললাম, যাও। সাবধানে থেকো। ছেলেটার চোখের পানি তখনো শুকোয়নি।

বাধন খুলে দিতেই এসে আমাকে জাপটে ধরল। জাপটে ধরে কাদছে। “থ্যাংক ইউ আংকেল , থ্যাংক ইউ”। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি গালে একটা চুমুও বসিয়ে দিয়েছে।

এই জীবনে এত অদ্ভুত ঘটনা আমি আর দেখিনি। ছেলেটা যখন দৌড়ে চলে যাচ্ছিল, একবার ভাবলাম পেছন থেকে গুলি করে দেই। এভাবে কথার বরখেলাপ করলাম , তাও আবছার ভাই এর সাথে। প্রেস্টিজ বলে কিছু থাকবে আমার এই লাইনে?

আমি আবসার ভাই কে ফোন দিয়ে বললাম, “সরি ভাই, পারিনি। টাকা দেয়া লাগবেনা”

বলেই ফোনটা বন্ধ করে রাখলাম কিছুক্ষণের জন্য। পরের দিন খবরের কাগজ খুলে অনেক ক্ষণ চুপ চাপ বসে রইলাম। ছেলেটাকে খুন করা হয়েছে। ছাব্বিশ টুকরা করা হয়েছে ডেডবডিটাকে। ছাব্বিশ টুকরা। বিশ টুকরা করার পর, আরো ছয়টি টুকরা।

আমি খুন করিনি, আরেকজন করে দিয়েছে আমার কাজ। আরো নিখুত ভাবে, আরো বিশ্রীভাবে, আরো নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে।

এই ঘটনার পরই আমি ভালো হয়ে যাই। এর পরে যে আঠারোটি খুন করেছি, তার সব গুলোই কপাল বরাবর গুলি করে। কোন অতিরিক্ত বাক্য এবং অতিরিক্ত রক্ত ব্যয় না করেই।

দ্রুত এবং পরিষ্কার মৃত্যু।