← Site আমি যেভাবে ভালো মানুষ হয়ে উঠলাম

Chapter 18 / 51 · 4 min

যে শাড়ি রেলিং থেকে ঝোলে


আজ রাতে যদি ঝুম বৃষ্টি হয়,তাহলে রাসমনির জীবনে হয়তো চব্বিশটা ঘন্টা যুক্ত হবে। চন্দ্রনাথ বিশ্বাস করে… এই চব্বিশ ঘন্টা ই তাদের জীবনকে বদলে দেবে। রাসমনি কে নিয়ে চন্দ্রনাথ কোলকাতা চলে যাবে। সেখানে আর কেউ খুঁজে পাবে না তাদের।

রাসমনি চন্দ্রনাথের ছোটবেলার বন্ধু।এক সাথে খেলেছে,দৌড়েছে,সাঁতার কেটেছে।কত মজার স্মৃতি… কতবার ছোট্ট রাসমনীকে ঘাসফড়িং ধরে দিয়েছে সে! কিন্তু রাসমনির বয়স যখন ১১,তখন দুম করে তার বিয়ে হয়ে গেল।চন্দ্রনাথ কিছু বুঝে উঠার আগেই।

বড়লোক পরিবার থেকে সম্বন্ধ এসেছিলো।বিঘেয় বিঘেয় জমি তাদের… একটা নাকি পাকা দালানও আছে।কিন্তু জামাইটা বুড়ো।পান খেয়ে বুড়োর হলদেটে দাঁত দেখেই সেদিন চন্দ্রনাথের আফসোস হয়েছিলো।রাসমনীর মতো এত সুন্দরী মেয়ের কিনা এইরকম ঘাটের মড়ার সাথে বিয়ে হচ্ছে!

রাসমনী যখন শ্বশুড়বাড়ীতে চলে গেল তখন চন্দ্রনাথ বুঝতে পারলো রাসমনীকে সে ভালোবাসতো।ঘাসফড়িং ধরে যখন সেটা কাওকে দিতে পারতো না … তখন তার বিচিত্র ধরনের কষ্ট হতো।রাসমনী যাবার আগে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলো,“চললাম রে চন্দ্র..”

সন্দেশ চিবুতে চিবুতে চন্দ্রনাথ বলেছিলো,“তোর বর এত বুড়া কেন রে?”

রাসমনি হাসার চেষ্টা করলো,“তুই ভাল থাকিস… আমি কানাঘাট চলে যাচ্ছি,ত্রিপুরায়।আর হয়তো দেখা হবে না”

“বাবা বলেছে,আমাকে কোলকাতা পাঠাবে।তোর সাথে আর দেখা না হলে ভালই হবে।বড্ড জ্বালাতি!”

“হয়তো.. আচ্ছা এই মাটির পুতুলটা রাখ।আমি বানিয়েছি..”

এবড়ো থেবড়ো মাটি দিয়ে গড়া অতি সাধারন একটা পুতুল… চন্দ্রনাথ হাতে নিয়েই ফেলে দিলো,“আমাকে মেয়ে পেয়েছিস?পুতুল দিয়ে খেলবো? যা ভাগ!!”

রাসমনির চোখে জল এসে পড়েছিলো।সেই জলের মর্ম যখন চন্দ্রনাথ বুঝলো ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে, ততদিনে কয়েক বসন্ত পার হয়ে গেছে, ততদিনে ছোট্ট শিমুল চারাটায় অনেক ডাল পালা গজিয়ে গেছে, ততদিনে রাসমনি নারীত্বে পা দিয়েছে, ততদিনে রাসমনি বিধবা হয়েছে।

রাসমনির স্বামী আছে - অন্য পুরুষ, এই ভাবনাটি চন্দ্রনাথকে যতটা দুঃখ দিত, তার চেয়ে অনেক ভারী একটা শীতল স্রোত চন্দ্রনাথের মেরুদন্ড বেয়ে নিচে নেমে গেল, যখন সে শুনেছিল সেই অন্যপুরুষটি আর নেই। রাসমনি হয়তো আরো কিছুক্ষণ বেঁচে থাকবে, তারপর তাকেও তার মৃত স্বামীর সাথে চিতায় জ্যান্ত পুড়তে হবে। কি অসম, অদ্ভুত , নির্মম একটি সমাজ ব্যবস্থা।

ট্রেন থেকে নেমে চন্দ্রনাথ পায়ে হেটে কানাঘাটের দিকে যেতে থাকে, আকাশে কালো গভীর মেঘ - চন্দ্রনাথ মনে প্রাণে বৃষ্টি চায় - ঝুম বৃষ্টি, যে বৃষ্টিতে আগুন ধরবেনা - রাসমনি চব্বিশটা ঘন্টা সময় পাবে, আর এই চব্বিশ ঘন্টাই বদলে দেবে তাদের সব কিছু।

চন্দ্রনাথ যখন রাসমনির বাড়ির কাছে পৌছালো, তখন সেখানে অনেক মানুষের জটলা, চন্দ্রনাথ কাউকেই চেনেনা - দূর থেকে সাদা শাড়িতে রাসমনিকে দেখেই তার বুকটা হু হু করে উঠলো, রাসমনীর কাছে যাওয়াটা কঠিন, কিন্ত অনেক কষ্টে কায়দা করে, সে যখন রাসমনির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, রাসমনী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল, “চন্দ্র?”

“হু”

“সতী পোড়ানো দেখতে এসেছিস?”

“রাসমনি!”

“দূরে থাকিস, মানুষ পোড়া গন্ধ ভাল হয়না।”

“আমি তোকে কোলকাতা নিয়ে যেতে এসেছি”, কথাটা বলতেই রাসমনির চোখে একটা আশা উঁকি দিয়ে যেতে দেখলো চন্দ্রনাথ - তারপর তার পুরো প্ল্যানটা বলল সে। রাসমনি প্রথমে ডুবে যাওয়া মানুষের খড়কুটা আকড়ে ধরার মত, এবং পরে একদম পুরোপুরি বিশ্বাস করে। সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলে, আর একটু সময় বেশী পেলে, এই বৃষ্টিতে সে চন্দ্রের হাত ধরে কোলকাতায় চলে যাবে।

সে কোন দোষ করেনি, তার মৃত্যু অবশ্যই অন্যায় - এবং তার বাঁচবার অধিকার আছে।

প্ল্যান অনুযায়ী ইশ্বর বৃষ্টি দিলেন, রাসমনীর সতীদাহ চব্বিশ ঘন্টা পেছালো, রাসমনী নির্ধারিত যায়গায় অপেক্ষা করলো - পুরো প্ল্যানে যেটি বদলে গেল, সেটি ছিল চন্দ্রনাথের মন।

শেষ মুহুর্তে চন্দ্রের মনে হলো, সতী নিয়ে পালিয়ে যাওয়া অনেক বড় পাপ - সেই পাপে ইশ্বর তাকে ছেড়ে দিলেও এই গ্রামে আফিমখোর মানুষগুলো তাকে ছাড়বে না। রাসমনি তো আর সেই ছোটবেলার রাসমনি নেই - বিবাহিতা, বিধবা এবং অন্য পুরুষের ভোগ করে ফেলা একটি মেয়ে। আবেগের বশে কি এত বড় ভুল করে ফেলা ঠিক হবে?

চন্দ্রনাথ যখন পুকুরপাড়ে বসে ঢিল ছুড়ছিল, তখন রাসমনিকে কয়েকজন লোক মিলে টেনে হিচড়ে চিতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, সাদা একটা লাশের পাশে তারা রাসমনীকে একটি চিতায় রেখে বেধে ফেলে। রাসমনি শেষবারের মতো আকাশ দেখে নেয় - এই পৃথিবীটা তার জন্য না।

রাসমনি যখন আগুনে পুড়ছিল, চন্দ্রনাথ তখন আগুনে পোড়ার ভান করছিল - পুড়ছিলনা।