← Site আমি যেভাবে ভালো মানুষ হয়ে উঠলাম

Chapter 16 / 51 · 7 min

একটু অক্সিজেন


জেলখানার দেয়ালে ঘড়ি নেই। আমার হাতেও নেই।তবু আমার চোখ বারবার দেয়াল আর হাতের কব্জি তে ঘোরাঘুরি করছিলো।সময়ের চিন্তাটা অনেক চেষ্টা করেও আমি মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না।

কালো কালো লোহার মোটা রড সামনে।এটা একটা খাঁচা.. আমার হঠাত্‍ টুপুরের টিয়া পাখিটার কথা মনে পড়ে গেলো।ওটাও খাঁচার মধ্যে ছিল।এখন কেমন আছে পাখি টা? টুপুর খাবার দিচ্ছে তো ওকে ঠিক মতো?ভুলে যাচ্ছে না তো?

বাইরে দাড়ানো গার্ডের দিকে তাকাতেই লোহার শিক গুলো ঝাপসা হয়ে গেল। আমি তাকে জিগ্যেস করলাম,“কটা বাজে??”

মিস্টি হেসে সে বললো,“আর পাঁচ ঘন্টা স্যার”

আমার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা হয়ে যেতে থাকে।ঠিক পাঁচ ঘন্টা পর পৃথিবী তে সবাই থাকবে কিন্তু আমি থাকবো না। আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে মেরে ফেলা হবে।

আগামীকালের সূর্যটা সবাই দেখবে কিন্তু আমি দেখবো না। আমি কখনোই তেমন খেয়াল করে সূর্য দেখিনি .. কিন্তু যদি জানতাম আজকের সূর্যটা আমার জীবনের শেষ সূর্য তাহলে আমি প্রান ভরে দেখে নিতাম। হঠাত্‍ করেই লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরের এই নক্ষত্রটির জন্য আমি বিচিত্র ধরনের মমতা অনুভব করতে থাকি।

ওরা আমাকে সূর্য ডোবার পর কনফার্ম করেছিলো।জেলার সাহেব নিজে এসেছিলেন। কুশলাদি বিনিময় করে হঠাত্‍ই বললেন, “আজ রাতেই আপনার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে।”

আমার মেরুদন্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।

“আজই স্যার?”

“হুম”

“কখন স্যার?”

“আর আট ঘন্টা পর।রাত একটায়”

আমি অপলক তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।জেলার সাহেব এখন কি বলবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়লেও আট ঘন্টা পর আমি যে পৃথিবীর অক্সিজেন আর টানতে পারবো না তা নিয়ে আমার কোন দ্বিধা রইলো না।

আমার অপরাধ, আমি একটা বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষন করেছি তারপর ঠান্ডা মাথায় খুন করেছি।

মেয়েটার নাম ফুলী।আমার বাসায় কাজ করতো।আমার সাথে খুব খাতির ছিলো ওর।দেখা হলেই হাত কপালে ঠুকে বলতো ,“সালাম সায়েব” ১২ কি ১৩ বছর বয়স।মিস্টি দেখতে.. চেহারাটা আজো ভাসে চোখের সামনে।

শুরুতে টুপুরের সাথে বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল ফুলীর।

টুপুর আমার স্ত্রীর নাম।মায়ের পর যে মেয়েটি আমার জীবনে প্রবেশ করেছিল তার নাম।আমি একজন সাদাসিধে ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম।সেন্ট জোসেফ.. নটরডেম .. বুয়েট তারপর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেলাম।একটা কোম্পানীতে নটা পাঁচটা চাকরী করতাম ..বাসায় এসে ঘুম ।মাস শেষে বেতন।

এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো।টুপুর শুরুতে বলতো “ভাল্লাগে না! তুমি এত বোরিং ক্যান?”

আমি শুধু হাসতাম।একটা সময় ও হাল ছেড়ে দিলো।ভালোই হলো.. আমি ঠান্ডা মানুষ.. ঠান্ডা ধরনের ভালবাসাই আমার পছন্দ।টুপুরকে আমি প্রচন্ড ভালবাসতাম এমনকী এত কিছুর পর এখনো বাসি।

” স্যার রাইতে কি খাইবেন??” কনস্টেবলের কথায় সম্বিত্‍ ফিরে পেলাম।আমার টুপুরের হাতে এক কাপ চা খেতে ইচ্ছা করছিলো কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়.. বললাম, “আলু ভর্তা আর ধোঁয়া উঠা গরম ভাত”

কনস্টেবল চলে গেল।টুপুর আলু ভর্তা একদম পছন্দ করতো না।বিশ্রী খাবার.. আসলে আস্তে আস্তে আমার সব কিছুই ওর বিশ্রী লাগছিলো।

ওর ফেসবুকে একটা ছেলের সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছিলো।ছেলেটা একবার বাসায়ও এসেছিলো.. নাম শুভ্র।টুপুরদের ভার্সিটিতেই BBA পড়তো।টুপুর সারাদিন আমার কাছে শুভ্রর গল্প করতো।

আমি শুনতাম.. ভাবতাম ভালোই হয়েছে.. মেয়েটা একটা বন্ধু পেল।কিন্তু সেই বন্ধুকে নিয়ে যে টুপুর এতকিছু করে বসবে সেটা ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করিনি।

সেদিন বৃহস্পতিবার ছিলো।আমি অফিস থেকে ফিরে বাসায় ঢুকছি এমন সময় একটা হুটোপুটির শব্দ শুনলাম।শব্দ ধরে এগিয়ে আমি বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখলাম ফুলি চিত্‍কার করে কাঁদছে।কেঁদে বলছে ..” আমি সায়েবরে সব কইয়া দিমু”

টুপুরের চেহারা তখন ডাইনী বুড়ির মতো।কোটর থেকে চোখগুলো বেরিয়ে আসছে..হিসহিস করে সে বললো ,” কি বলবি তুই?”

“আফনে সারেবরে ঠকাইছেন।ঐ বেডাটার লগে আফনে প্রতিদিন ঐ রুমে.. ” ফুলি কথা শেষ করতে পারে না।তার আগেই টুপুর সামনে থাকা বটি টা দিয়ে ফুলির ঘাড়ে একটা কোপ দেয়।

ফুলির আর্তচিত্‍কারটা প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে।আমি টুপুরকে থামাতে এগিয়ে যাই।টুপুর কে থামানোর আগ পর্যন্ত টুপুর ফুলীকে বটি দিয়ে ক্ষত বিক্ষত করতে থাকে।

ঘাড় আর গলায় বটির কোপ.. গলা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে।মাথায় কোপ লেগে মস্তিষ্কের অনেকটা বেরিয়ে এসেছে।ক্ষতবিক্ষত শরীর টা দেখে আমি বুঝে গেলাম ওকে হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।

কিছুক্ষনের মধ্যেই টুপুরের হিংস্র মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।ও আমাকে ঠেলে বেরিয়ে গেল।ঘটনার আকস্মিকতায় ফুলির রক্তাক্ত লাশের সামনে আমি হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলাম।

খাওয়া শেষে আমি চুপচাপ বসে আছি।

খাবার গলা দিয়ে নামছিলো না।যে খাবারটি আমার পেটে হজম হওয়ার আগেই হজমের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে… এই খাবার সত্যিই অর্থহীন,একটা রসিকতা।

কিছুক্ষন পর আরেকটা কনস্টেবল আসলো.. ” স্যার চলেন,গোসল কইরা আসেন”

“এখনই?আর কতক্ষন?”

“আর এক ঘন্টা।জলদি করেন।ম্যালা কাম বাকী..”

আমি বাথরুমে যাই।গরম পানিতে গোসল করতে থাকি।কেমন যেন লাগছে।ঠিক মত চিন্তা করতে পারিনা।গুলিয়ে যাচ্ছে সব।

আমি চেষ্টা করি নিজের ভেতর কিছুতেই কিছু আসে যায় না এই অনুভূতিটি নিয়ে আসতে।

কাঠগড়ায় এই অনুভূতিটি কাজ করছিলো।আমি অবাক হয়ে আমার আশে পাশের মানুষদের দেখছিলাম।আত্মীয় নেই স্বজন নেই , বন্ধু নেই বান্ধব নেই। নিঃসঙ্গ মানুষ আমি।কেউ লড়েনি না আমার পক্ষে।

অদ্ভূত এক অলসতায় আমি স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলাম.. দেখিনা কি হয়।ওপারে টুপুর বলে চলেছে..” .. এই লোকটা যে কিনা আমার স্বামী.. যাকে স্বামী বলতে আমার ঘেন্না হচ্ছে সে একটা নরপশু।মেয়েদের প্রতি সে হিংস্র.. ও স্যাডিস্ট। … তারপর ক্ষত বিক্ষত করে মেরে ফেলল ফুটফুটে মেয়েটাকে”

কত সুন্দর অভিনয় করতে পারে আমার টুপুর।আমার বুকের ব্যাথাটা ঠোটের কোনে ধরে রেখেছিলাম।এটা দেখে কি টুপুরের একটুকু কষ্ট হবে না??

কষ্ট হয়নি ওর।আমি এখনো বুঝতে পারিনা ফুলির দেহে ধর্ষনের আলামত পাওয়া গেল কিভাবে? পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বদলে গেল কিভাবে আর বটি টাতে আমার হাতের ছাপ আসলো কিভাবে..

বারান্দা দিয়ে হেটে যাচ্ছি।জেলখানার সামনের মাঠে ফাসির মন্চ।আমার পা দুটো অবশ হয়ে আসছে।আর পারছিনা এগুতো।পা টা খুব ভারী হয়ে গেছে।

না… ঐ মন্চের দিকে আমি এগুতে পারবো না।আমি কাওকে ধর্ষন করিনি, আমি কাওকে খুন করিনি।আমি বাঁচতে চাই,কাল আমার কলিগরা অফিস যাবে.. নটা পাঁচটা অফিস করবে।বাচ্চারা স্কুলে যাবে ফুল ফুটবে পাখি গান গাবে অথচ এসব কিছুই আমি দেখবো না!ওরা দেখতে দেবে না!

হঠাত্‍ করে ফুল পাখি স্কুল সূর্য ভোর এসব অতি সাধারন জিনিস আমার কাছে দুর্লভ মনে হতে থাকে।পৃথিবীটাকে দুর্বোধ্য জটিল এবং খুবই নির্মম মনে হতে থাকে।

একটা মৃত্যুর জন্য কত আয়োজন করেছে এরা.. কত মানুষ।এটাই জল্লাদ?ও ই আমাকে মেরে ফেলবে?এই এম্বুলেন্সটা আমার লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য?? নিজের লাশের কথা ভেবে আমার অনুভূতিগুলো ভোঁতা হতে থাকে।

ম্যাজিস্ট্রেট বললেন,“আর পাঁচ মিনিট.. শেষ ইচ্ছা কি আপনার?”

শেষ মুহুর্তে আমার একটা বিচিত্র শখ হলো।ফেসবুকে টুপুরকে একটা ম্যাসেজ দেব।জিগ্যেস করবো,” কেন এমন করলে??

আমি মরে যাচ্ছি।আমার লাশ দেখতেও তুমি আসবে না।তবু জেন আমি তোমাকে ভালবাসি..” এটা পড়ে নিশ্চয় টুপুর অনেক কাঁদবে।ওর অনুশোচনা হবে।এই অবস্থায়ও শান্তি লাগলো এটা ভেবে।

ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল থেকে শেষবারের মতো লগ ইন করলাম।অনেক গুলো নোটিফিকেশন .. এজীবনে আর চেক করা হলো না।

টুপুরই একটা ম্যাসেজ দিয়েছে।লিখেছে ..”SORRY”

এতটুকুই।তারপর ব্লক করে দিয়েছে।আমার শেষ ইচ্ছাটা পুরন হলো না।

মোবাইল ফিরিয়ে দিয়ে আমি প্রস্তুত হলাম।আমার প্রচন্ড ভয় লাগছে।জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি দাড়িয়ে থাকাটা খুব নির্মম এবং ভয়ানক অনুভূতি।আমার মনে হচ্ছে এটা বুঝি দুঃস্বপ্ন।এক্ষুনি আমার ঘুম ভেঙে যাবে আর আমি দেখবো আমি আমার পরিচিত বিছানাই।কেউ নেই!ওরা কেউ নেই!!

শেষ বারের মতো পৃথিবীকে দেখে নিলাম।কালো টুপির কালো কাপড় আমাকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।আমার ভয় লাগে.. প্রচন্ড ভয় .. এই বুঝি ম্যাজিস্ট্রেট তার হাতের রুমালটা ফেলে দিলো!

টান টান উত্তেজনা।আমি অপেক্ষা করতে থাকি ধ্বংসের জন্য।ঠিক তখনই প্রচন্ড ঝাকুনি।দেহের সবটুকু ভর এসে পড়লো গলায় উপর।ম্যানিলা রোপ আমার গলায় শক্ত হয়ে এটে যায়।আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।এতটুকু অক্সিজেনের জন্য বুকটা হাহাকার করতে থাকে।আমি মরতে চাই না .. আমি বাঁচতে চাই।আমাকে একটুখানি অক্সিজেন দিবা আল্লাহ?? এই একটুখানি অক্সিজেন?? .. প্লীজ! একটুখানি .. ???