Chapter 12 / 51 · 5 min
মৃত নদীর শীত
আমি নূপুরকে আরো একটু কাছে টেনে আনলাম, নুপুর বিরক্ত হবার ভান করলেও ঠোটের কোণে হাসিটুকুর কারনে বিরক্তিটা ঠিক মত ফুটে উঠলো না। নুপুর বলল,“আচ্ছা কি হচ্ছে এইসব… আশে পাশে কত্ত মানুষ দেখতেসো না?”
আমি নিঃশব্দে হাসলাম,“নিজের বউকেই তো কাছে আনসি… সমস্যা কই?”
নুপুর কপট রাগটা ধরে রেখেই বলল,“২৪ ঘন্টা হয় নাই বিয়ে হইসে… ৪৮ বার বউ ডেকে ফেলসো!!”
“ডাকবো না তো??”
“প্লীজ… এখন চুপ কর তো।আমার খুবই লজ্জা লাগতেসে।বাসায় যাই,সব হবে।তখন যা ইচ্ছা বইলো… বাসে অনেক জ্বালাইসো এইবার লঞ্চে শান্তি দাও”
আমি আরেকটূ শক্ত করে নুপুরকে চেপে ধরে বললাম,“আচ্ছা সব হবে তো?? স-অ-অ-অ-ব???”
“অসভ্য কোথাকার!!” বলে নুপুর আমাকে ঠেলে কেবিনের দিকে চলে গেলো।লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে তখন আমার নীল আকাশ, আর গাড় নীল পানি দেখে অদ্ভুত আনন্দ হল।
আজ সব কিছুই ভাল লাগছে।চার বছর ধরে যেই মেয়েটাকে একটু একটু করে আপন করে নিয়েছি, সুখ দুঃখ , ভাললাগা আর মন্দ লাগা সব কিছু শেয়ার করে বেচে ছিলাম, আজ সেই মেয়েটাকে যখন কাগজে কলমে জীবন সংগীনী হিসেবে পেলাম, তখন মনে হলো এই মুহুর্তে মরে গেলেও আমি বেশী দুঃখ টুঃখ পাবো না।
মেয়েটা একটু লাজুক, কিন্তু পাগলের মত ভালবাসে আমাকে। এখনো মনে আছে একবার রাগ করে তিন দিন ফোন অফ রেখেছিলাম… চতুর্থদিনে হঠাত দেখা হয়ে যাবার পর তার সে কি কান্না! সবটুকু অভিমান বাষ্পধোঁয়া হয়ে উড়ে যাওয়া পর্যন্ত নুপুর আমাকে জড়িয়েই ধরে রাখল।কাদতেই থাকলো!
সেই দিনই… জীবনের প্রথম চুমুটি একে দিয়েছিলাম মেয়েটার ঠোটে।প্রথম চুমু কেউই ভোলে না, আমিও ভুলিনি। ৪ বছর পর অবশেষে প্রেমটা পরিনতি পেল।বাসায় সবাই অপেক্ষায়,মা বাবা - বউ দেখতে চায় এবার, অনেক তো লুকোচুরি হলো!
০২। কেবিনের ভেতরে সেই কখন থেকে গল্পের বই এ মুখ গুজে রয়েছে নুপুর, একটু বিরক্ত লাগলো… নতুন বিয়ে করলাম, একটু কথা তো বলবে? এত কড়া শাসন করলে হয়? আমি ডাকলাম,“ম্যাডাম?”
নুপুর মাথা না তুলেই বলল,“ইয়েস স্যার…”
“বলতেসিলাম… কেবিনের ভেতরে তো কেউ নাই”
“চুপ থাক !!”
“একটা চুমু, ব্যাস… আর ডিস্টার্ব করবো না!”
“উহু… বাসায় গিয়ে”
“প্লীজ!!”
অনূমুতি খুজে আজ লাভ হবেনা, বুঝলাম। এগিয়ে গেলাম ওর দিকে, জাপটে ধরতেই লঞ্চটা হঠাত দুলে উঠলো!! আমার মেরুদন্ড দিয়ে হঠাত একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।লঞ্চ টা তখন দুলেই যাচ্ছে, দুলেই যাচ্ছে।
আমি জানি কিছুই হবে না, তবু ভয় লাগছিল প্রচন্ড।নুপুর আমার চেয়েও বেশী ভয় পেয়েছে।এবার ও ই আমাকে জাপ্টে ধরে কেদে ফেলল।উহু, এভাবে তো জড়িয়ে ধরতে চাই নি !
লঞ্চটা ডান দিকে কাত হয়ে গেল, একদম হঠাত করে।কিভাবে কি হলো কিছু বুঝে উঠার আগেই আমি বাইরে মানুষের চিৎকার শুনতে পেলাম।আমি নুপুরকে বললাম, “তুমি তো সাতার জানো, ভয় কিসের?কিচ্ছু হবে না”
বাইরের চিৎকার চেচামেচি তখন অসহ্য লাগছে।নুপুর বলল,“তুমি তো সাতার পারো না!”
আমি হাসলাম,“লাইফ জ্যাকেট আছে… ভয় পেও না, মরলে দুইজনই মরলাম …”
আমি কথা শেষ করবার আগেই লঞ্চটা ডানদিকে কাত হয়ে একনিমেষে ডূবে গেল।কেবিনের ভেতরে পানি, লঞ্চ গভীরে যাচ্ছে, আমরা কোনমতে লঞ্চ থেকে বেরুলাম।আমি শক্ত করে নুপুরের হাত ধরে রেখেছি… বুকের ভেতরে প্রচন্ড ভয়, মাথা কাজ করছে না ঠিক মত।
নোংরা ঠান্ডা পানি নাক মুখ দিয়ে ঢুকছে,আমরা দুইজন দুইজনকে জড়িয়ে ধরে রেখেছি তাই কেউই তখন ভেসে থাকতে পারছলাম না। আমার মনে হলো নুপুরকে ছেড়ে দেয়া উচিত, কিন্তু জীবনের শেষ মুহুর্তে… নুপুরকে ছাড়তে ইচ্ছা করলো না,হাবুডুবে খেয়ে খেয় আমরা একজন আরেকজন কে জড়িয়ে ধরে রাখলাম!
কিন্তু হঠাত নুপুরের যেন কি হলো,গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ও আমার থেকে আলাদা হয়ে গেল জোর করে, চলে যেতে চাইলো সাতরে!! আমি খড়কুটোর মত নুপুরের কাপড় আকড়ে ধরলাম, আটকাতে পারলাম না… নিজেই ডুবে যাচ্ছিলাম বার বার।
নুপুরের নুপুর লাগানো পা’টা পেলাম,সেইটাই ধরে একটু ভেসে থাকতে চাইলাম… এত বড় নদীর গভীরে, হারিয়ে যেতে চাই না, খুব বাচতে ইচ্ছা করে, বাসায় যেতে ইচ্ছা করে, ডুবে মরতে চাই না… আম্মা নিশ্চয় গরম ভাত বেড়ে অপেক্ষা করছে।
এসব ভাবতে ভাবতেই নুপুরকে কাছে দেখতে পেলাম,পা কখন ছেড়েছি জানিনা, নুপুরকে আবার পেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম… পরম ভালবাসায়।
কিন্তু,নুপুর কেন আমার গলা জড়িয়ে ধরলো বুঝলাম না,হাত দিয়ে ধরে নি… ওর ওড়না দিয়ে পেচিয়ে ধরেছে, জোরে… খুব জোরে, একটা নিশ্বাস নেয়ার জন্য, এতটুকু অক্সিজেনের জন্য বুকের ভেতরটা হাহাকার করতে থাকে,আমি হাতের জোর টুকু হারিয়ে ফেলছি, নুপুরকে থামাতে গিয়েও পারলাম না।
এইভাবে মরে না গেলেও পারতাম, পুরোপুরি মরে যাওয়ার আগেই নুপুর আমাকে ছেড়ে দিয়ে সাঁতরে চলে গেল… এইবারে ওকে আটকানোর শক্তিটুকু আমার ছিল না।
আমি এরপর গভীরে যেতে থাকলাম.. অক্সিজেনের দরকার ফুরিয়ে গেছে, গভীরে যাচ্ছি, আরো গভীরে, অন্ধকারে যাচ্ছি, আরো অন্ধকারে।তারপর এই মৃত নদীর শীতে আমি মরে পড়ে রইলাম!
ভাগ্যিস কেউ আমার চোখ দুটো দেখবে না, দেখলে চমকে উঠতো… পানিতে ডুবে মরা একজন মৃত্যুর আগে কি অবাক দৃষ্টিতেই না তাকিয়ে ছিল সামনের দিকে!
(Based on real event)